Home » বাঁক বদলের সময় এখন

বাঁক বদলের সময় এখন

0 মন্তব্য 95 ভিউজ

মাহমুদুল হাসান শামীম

বাঁক বদলের সময় এখন বাংলাদেশের নারী ফুটবলে। নেপালে প্রথমবারের মতো সাফ ফুটবলের শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা। শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান, ভারত ,নেপাল দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দলকে হারিয়ে অনন্য কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তারা। ভারতের সঙ্গে আগের দশবারের এবং নেপালের সঙ্গে আটবারের মোকাবেলায় জয়ের কোন দেখা ছিল না। এবার সেই ভারত আর নেপালকেও দাপটের সঙ্গে হারিয়েছে বাংলাদেশের ফুটবলকন্যারা। টানা পাঁচটি ম্যাচেই ছিল  উঁচু মাত্রার চোখ জুড়ানো ধারাবাহিক পারফরমেন্স। বেশকটি গোল ছিল বিশ্বমানের।

আক্রমণে পাসের নিখুঁত জাল, দুরন্ত গতি , ক্ষিপ্রতা, ফুটবল সেন্স এবং পজিশনাল পারফেক্শন ছিল চমৎকার। ডিফেন্স ছিল প্রায় দূর্ভেদ্য। আর বাংলাদেশের গোলরক্ষকের মুন্সিয়ানা তো সবার মুখে মুখে। সব মিলিয়ে মেধা,দক্ষতা ও পরিকল্পনার বাস্তবায়নের সফল ডিসপ্লে ছিল বাংলাদেশের নারীদের ধারাবাহিক ভাল পারফরমেন্স। তাদের এই চোখ জুড়ানো ণৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী। আর বাংলাদেশের মানুষ তাদের কন্যাদের এই সাফল্যে হয়েছেন গর্বিত, আনন্দিত। ফুটবলকন্যাদের এই অর্জন বাংলাদেশের মানুষকে কিভাবে নাড়া দিয়েছে বিমানবন্দরে নারী ফুটবলদলকে রাজর্ষিকবরণ এবং বিমানবন্দর থেকে বাফুফে ভবন পর্যন্ত রাজপথে জনসমুদ্রের অভিনন্দন তারই প্রতিফলন।

কেন এত উচ্ছাস

ফুটবলকন্যাদের এই সাফল্য শুধু একটি শিরোপা জয়ের অর্জনই নয়। এই শিরোপা জয় অনেক যুদ্ধ জয়ের প্রতীক। বাংলাদেশের একেবারে প্রান্তিক সমাজের সন্তান আমাদের নারী ফুটবল দলের কন্যারা। কঠিন ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, কঠোর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, আর নির্মম দারিদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এই মেয়েদেরকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। তাদের এই সাফল্য— ব্যক্তির মুক্তি,রক্ষণশীলতার শৃংখল ভাঙ্গার মুক্তি, সামাজিক প্রতিবন্ধকতার দেয়াল গুড়িয়ে দেয়ার মুক্তি, দারিদ্র জয়ের মুক্তি। সংগ্রামী কন্যাদের  এই অর্জন বাংলাদেশের সব নারীর মুক্তির নিশান। শুধু নারী নয় বাংলাদেশের সব মানুষের জন্যই অনুপ্রেরণার অনির্বাণ সু্র্য। এরা যেধরণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে উঠে এসে  জাতির জন্য ইতিহাস গড়া সম্মান বয়ে এনেছেন তা বাংলাদেশের ঘরে ঘরে লাখো কন্যা-পুত্রকে এগিয়ে চলার স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রেরণা জোগাবে। আমরাও পারি-আমরাও পারবো এই আত্মশক্তিতে জেগে উঠতে সাহস জোগাবে এই জনপদের সবাইকে। এ জন্যই ফুটবল কন্যাদের সাফল্যে বাংলাদেশের সব মানুষের মাঝে এত উচ্ছাস, এত আনন্দ।

পথ হারানো যাবে না

সম্বর্ধনার বন্যায় ভাসছেন ফুটবলকন্যারা। জুটছে একের পর এক পুরষ্কার। একটি সাফল্য আরো সাফর‍্যের পথে এগিয়ে যেতে সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগায়। আবার সাফল্য কাউকে কাউকে পথ হারানোর সর্বনাশও ঘটায়। ফুটবলকন্যারা এখন জাতীয় তারকা, সেলিব্রেটি। হাজারো চোখ তাদের দিকে। পুরষ্কারের ঢল। অর্থ-বিত্তেরও প্রাচুর্য্য আসবে। বদলে যাবে ওদের কাছে জীবনের ছবি। এ সময় মাথা ঘুরতে দেয়া যাবে না। পা রাখতে হবে মাটিতে। বাফুফের নারী ফুটবলের কর্তারা এতদিন যে সফল কাজটি করেছেন সেটি এখনও করতে হবে আরো সতর্কতার সাথে। নিয়ম শৃংখলা আর কঠোর নজরদারির মধ্যে আপন সন্তানের মতো তারা যেভাবে এদের পরিচর্যা করেছেন। আগলে রেখেছেন সেটি এখন আরো নিবিড়ভাবে করতে হবে।

বাঁক বদলের সময়

মনে পড়ছে ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের কথা। আকরাম-নান্নু বুলবুলদের নিয়ে সেই সময় এমনই উচ্ছাস ছিল দেশজুড়ে। ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নটি পূর্ণ হয়েছিল আইসিসি ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে। সেই স্বপ্নজয় আরো বড় স্বপ্নের পথে হাটার রাস্তা তৈরির সাহস ও অনুপ্ররণা জুগিয়েছিল। ক্রিকেট বোর্ডের কর্তারা সেই সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে শূণ্য থেকে উঠে আসা ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নেয়ার অভিযাত্রা শুরু করেছিলেন। তার ফল বিশ্বঅঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আজকের অবস্থান।

সাফ শিরোপা জয়ে বাংলাদেশের নারী ফুটবলে বাঁক বদলের যথার্থ সময় এখন। বাফুফেকর্তাদেরকে এই সাফল্যকে ব্র্যান্ডিং করে নারী ফুটবলের জন্য স্পনসর টেনে আনতে হবে। স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা তৈরী করে আশা ও সম্ভাবনার আলো জ্বালাতে হবে। তাহলে অনেকেই এগিয়ে আসবে নারী ফুটবলের পাশে। যেমনটি এসেছিল পেছনে থাকা ক্রিকেটের পাশে এগিয়ে চলার রসদ জোগাতে। সেই ক্রিকেট আজ কোথায়।

এখন অনেকেই নারী ফুটবলারদের বেতন ভাতা নিয়ে কথা বলছেন। বাফুফে সাধ্যানুযায়ী এতদিন এদের সহায়তা করেছে। এখন স্পনসর পেলে অবস্থা পাল্টে যাবে যেমন পাল্টে গেছে ক্রিকেটারদের চিত্র। ফুটভরের তখন সোনালী সময়।  মুন্না-আসলাম-সাব্বির-রুমিরা ২০লাখ, ১৬ লাখ, ১৪ লাখ ১২ লাখ টাকা পেতেন। বড়মাপের ক্রিকেটাররা পেতেন ২লাখ ৩ লাখ। তাও ছিল অনিশ্চিত। মাসের পর মাস টাকা না পাওয়ায় ক্ষোভে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ব্যাট-প্যাড পুড়িয়ে ক্রিকেটারদের প্রতিবাদ জানানোর ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এখন ক্রিকেটের দিন বদলেছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী বের্ডগুলোর একটি বাংলাদেশ ক্রিকেটবোর্ড। জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা এখন বড় বড় তারকা অর্থ এবং সম্মান সব নিক্তিতেই। বাংলাদেশের নারী ফুটবলেও ঘটনো সম্ভব এই বিপ্লব। এ জন্য উদ্যোগী হতে হবে ফুটবল কর্তাদের। রুটিন কর্মকান্ডের পাশাপাশি উদ্ভাবনী পরিকল্পনায় সক্রিয় হতে হবে তাদের।

শুরু হোক দিন বদলের তৎপরতা

বাফুফের সৌভাগ্যই বলতে হবে ক্রীড়ামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন নারী ফুটবল একাডেমির যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করবে সরকার। এজন্য একটি ডিপিপি তৈরী করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে । তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে আশ্বাস দিয়েছেন বাফুফের নারী ফুটবল একাডেমিগুলোকে আর্থিকভাবে সহায়তা দেবে সরকার। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ক্রীড়াপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শতভাগ সহযোগিতা পাওয়া যাবে এতে।

*** জমজমাট নারী ফুটবল লীগের আয়োজন করতে উদ্যোগী হতে হবে বাফুফেকে। প্রথমসারির সবগুলোক্লাবের নারী ফুটবল দল গঠন ও লীগে অংশ নেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে প্রচুর সংখ্যক মেয়ে প্রতিদ্বন্দীতামূলক ফুটবল খেলার সুযোগ পাবে। সেইসঙ্গে তাদের জন্য অর্থ আয়েরও সুযোগ হবে। সাফ ফুটবলে মেয়েদের এই সাফল্যে ও দেশজুড়ে উচ্ছাস ও উদ্দীপনার পর বোধহয় মেয়েদের দলের জন্য স্পনসর পেতে খুব অসুবিধা হবে না। লিগ জমজমাট করতে পারলে বদলে যাবে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের চিত্র।

*** এবারের সাফল্য ধরে রাখতে হবে আগামীতেও। না হলে নারী ফুটবল নিয়ে উদ্যমে ভাটা পড়বে। সে জন্য বয়সভিত্তিক চলমান প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরো পরিকল্পিতভাবে সক্রিয় রাখতে হবে। দেশজুড়ে প্রতিভা হান্টিংয়েও নজর রাখতে হবে।

স্বপ্ন হোক এশিয়া কাপ বিশ্বকাপে খেলা

সাফ শিরোপা জযের স্বপ্ন পুরণ করেছে সাবিনারা। সে সাফল্য ধরে রাখার দায়িত্ব এখন তাদের উত্তরসুরিদের। আর সাবিনারা নতুন স্বপ্ন দেখবেন এশিয়া কাপে, বিশ্বকাপে খেলার। এখনই বাফুফেকে নামতে হবে সে পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়নে।নিয়মিত লীগ আয়োজনের পাশাপাশি  জাতীয় নারী ফুটবলদল যেন বেশি বেশি আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলতে পারে, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। পূর্ব এশিয়া,মধ্য এশিয়ার দলগুলোর সঙ্গে জাতীর দরের খেলার আয়োজন করতে হবে। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মেয়েদের সঙ্গে খেলার সুযোগ পেলে বাংলাদেশের মেয়েরা অভিজ্ঞতায় আরো পোক্ত হবেন। উদ্যোগী হলে এই তিন দেশের কাছ থেকেই হয়তো সব ধরণের সুবিধা পাওয়া যাবে নারী ফুটবল সিরিজ বা টুর্নামেন্ট আয়োজনে। বাংলাদেশ নালি দলের জন্য এসব দেশের বড় বড় কোম্পানী / বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্পনসরশিপ পেতেও সহযোগিতা করতে পারে ঐ দেশগুলোর ফেডারেশন, রাস্ট্রদূতরা।

ভিন দেশের লিগে খেলা

বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে ভিন দেশের লিগে খেলা। খবর ছড়িয়েছে আমাদের জাতীয় নারী দলের ফুটবলাররা ভিন দেশী বিভিন্ন লিগে খেলার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। এটি হলে খুবই ভালো। বাফুফে এদেরকে বিভিন্ন লিগে বিশেষ করে ইউরোপীয় কোন লিগে খেলানোর জন্য উদ্যোগী হতে পারে। আন্তর্জাতিক ফুটবল এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলতে পারে। এতে বানিজ্যিক একটি সম্ভাবনার নতুন পথ উন্মোচিত হতে পারে। ইউরোপের ক্লাবে খেলোয়াড় নেয়ার ব্যবস্থা করতে পারলে বাফুফে ট্রান্সফার ফি/সাইনিং মানি পেতে পারে।ফলে এদের পরিচর্যায় যে অর্থ খরচ হয়েছে তার কিছুটা উঠে আসবে।  সেই সঙ্গে খেলোয়াড়রাও বিদেশী ক্লাব থেকে পাবেন ভালো অর্থ।

সাফ শিরোপা জয় যে সম্ভাবনাগুলো তৈরী করেছে সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে বাঁক বদলের সময় এখন। সময় এখন বাংলাদেশের নারী ফুটবলে দিন বদলের।

 

 

 

 

 

 

আরও পড়ুন

মতামত দিন

আমাদের সম্পর্কে

We’re a media company. We promise to tell you what’s new in the parts of modern life that matter. Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo. Sed consequat, leo eget bibendum Aa, augue velit.