Home » কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী থেকে বৈশ্বিক মঞ্চে কাতার

কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী থেকে বৈশ্বিক মঞ্চে কাতার

0 মন্তব্য 99 ভিউজ

প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধের পথ ধরেই কাতার রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন। ক্ষুদ্র দেশটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে বৈশ্বিক রাজনৈতিক মঞ্চের অংশ হওয়ার বিকল্প নেই। শেখ হামাদ ও শেখ তামিমের হাত ধরে সেই পথে দৃঢ় ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে কাতার। ভূখণ্ডগত ক্ষুদ্রতা কিংবা জনসংখ্যার স্বল্পতা দেশটির এই পথচলায় বাধা হতে পারেনি।

যৌথভাবে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে কাতার। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এর আয়তন ১৩ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপের আসর বসতে যাওয়া কাতারের আয়তন এর চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটার কম। যুক্তি দেওয়া যেতে পারে, আয়তন দিয়ে কি সবকিছুর মূল্যায়ন হয়? তবে শুধু সম্পদ দিয়েই যে সবকিছু হয় না, তার প্রমাণ আফ্রিকার এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের আরও বহু দেশ।

আরব উপদ্বীপের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ কাতার। অথচ দিন-দুনিয়ার ন্যূনতম খোঁজ রাখেন এমন কেউ দেশটির নাম জানেন না তা বলা দুষ্কর। তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ দেশটিকে জগৎজোড়া পরিচয় এনে দিয়েছে দক্ষ নেতৃত্ব আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নীতি-কৌশল। ক্রীড়া জগতের চেয়েও বৈশ্বিক রাজনীতিতে কাতারের অবস্থান পোক্ত। মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা দিয়ে দেশটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আর এভাবেই বৈশ্বিক মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে কাতার।

বাবা-মায়ের হাত ধরে উত্থান, ছেলের হাতে ভবিষ্যৎ

কাতারের আয়তন মাত্র ১১ হাজার ৫২১ বর্গকিলোমিটার। দেশটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। তবে কাতারের নিজ নাগরিকের সংখ্যা ৩ লাখ ৮০ হাজারের মতো। বাকিরা বিদেশি ও অভিবাসী শ্রমিক। ভূখণ্ডগত ক্ষুদ্রতা কিংবা জনসংখ্যার স্বল্পতা দেশটির আকাশসম স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারেনি। অবশ্য টিকে থাকার জন্যও দেশটির বড় স্বপ্ন দেখার বিকল্প ছিল না।

মাথা উঁচু করে টিকে থাকার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি। ১৯৯৫ সালে ক্ষমতা নেওয়ার পর দেশটির নীতি-কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনেন তিনি। পূর্বসূরির নীতি থেকে সরে এসে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবের অধীন থেকে বের করে আনতে শুরু করেন তিনি। তিন দিকে পারস্য উপসাগরের জলরাশিবেষ্টিত দেশটির একমাত্র সীমান্তটি এই সৌদি আরবের সঙ্গেই। আর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি এই কাতারেই। দেশটিতে সামরিক ঘাঁটি আছে তুরস্কেরও।

কিংস কলেজ লন্ডনের ডিফেন্স স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক ডেভিড রবার্ট বলেন, বিশেষ করে সাবেক আমির শেখ হামাদের নেতৃত্বে কাতার নিজের এবং তার নীতিগুলোর জন্য একটি আলদা যথাযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে চেয়েছিল।…আঞ্চলিক রাজপরিবারগুলোর সমন্বয়ে গঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) বৃহত্তর ঐকমত্যের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে।

আধুনিক কাতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এই পথে শেখ হামাদ যোগ্য সঙ্গী হিসেবে পান স্ত্রী মোজাহ বিনতে নাসের আল মিসনেদকে। তিনি আর দু-একজন আরব শেখের স্ত্রীর মতো নন। কাতারের নীতি-কৌশল প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এই নারী। ‘ফ্যাশন আইকন’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া শায়খা মোজাহ কাতার ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থাকে পশ্চিমা ধাঁচে সাজান তিনি।

নানা জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেখ হামাদ ২০১৩ সালের ২৫ জুন ছেলে বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। দায়িত্ব গ্রহণের সময় শেখ তামিমের বয়স ছিল ৩৩ বছর। ওই সময় পর্যন্ত আমিরের দায়িত্ব গ্রহণ করা সবচেয়ে কনিষ্ঠ আরব শাসক।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি থেকে গ্র্যাজুয়েশন করা শেখ তামিম নানা প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে বাবা-মায়ের দেখানো পথেই এগিয়ে যাচ্ছেন। আরবির পাশাপাশি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন তিনি। খেলাধুলা অন্তঃপ্রাণ নতুন আমির রাজপ্রাসাদে ক্ষমতা পোক্ত করার পাশাপাশি একটি দক্ষ ক্রীড়া প্রশাসনও গড়ে তুলেছেন।

কূটনৈতিক মধ্যস্থতার কেন্দ্র

বাবা শেখ খলিফা বিন হামাদ আল-থানিকে ১৯৯৫ সালে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেশের পররাষ্ট্রনীতি ঢেলে সাজান শেখ হামাদ। তিনি আঞ্চলিক পরাশক্তি সৌদি আরবের ওপর থেকে নির্ভরতা কমানোর কৌশল নেন। শেখ হামাদ উপলব্ধি করেন, সার্বভৌম দেশ হিসেবে টিকে থাকতে হলে ক্ষুদ্র কাতারকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক মঞ্চে জায়গা করে নিতে হবে।

নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার সুপরিচিত। দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বহু বিরোধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে দেশটি। লেবানন, ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া, লিবিয়া, সুদানসহ বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ও দ্বিপক্ষীয় বিরোধ সমাধানে এই ভূমিকা পালন করে আসছে দেশটি। পরমাণু কর্মসূচি ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠক আয়োজনে দোহা ভূমিকা রেখেছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এ ছাড়া সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইরান ও তুরস্কের বিরোধ নিরসনের প্রস্তাব দিয়েছে কাতার।

তবে কূটনৈতিক মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে আল-থানি পরিবারের মুকুটে বড় অর্জন হয়ে থাকবে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিচুক্তির বিষয়টি। বলতে গেলে আফগান শান্তিপ্রক্রিয়ার পুরো বিষয়টি সম্পন্ন হয়েছে কাতারে। ফের ক্ষমতায় আসার আগে আফগানিস্তানের বাইরে তালেবানের একমাত্র কূটনৈতিক মিশন ছিল দোহায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দোহায় তালেবানের সম্পাদিত শান্তিচুক্তির ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের মধ্য আগস্টে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

আল-জাজিরা ও সফট পাওয়ার

আল-থানি পরিবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা থেকে আরও স্বাধীন ভূমিকার দিকে নজর দেয়। নতুন পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে গণ-কূটনীতির দিকে নজর দেয় দোহা। এই নীতিরই অংশ হিসেবে আরব বিপ্লবের পক্ষে অবস্থান নেয় দেশটি। গণ-কূটনীতির লক্ষ্য অর্জনে সফট পাওয়ারের দিকে ঝোঁকে কাতার।

ওই কৌশলেরই অংশ হিসেবে ১৯৯৬ সালে বিশ্বমানের সংবাদমাধ্যম হিসেবে কাতারে শুরু হয় আল-জাজিরার পথচলা। ইতিমধ্যে একক চ্যানেল হিসেবে আরব বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দর্শক টানতে সক্ষম হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের ভাবমূর্তি বাড়াতে যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে আল-জাজিরাকে কাজে লাগায় কাতার।

অবশ্য আল–জাজিরা প্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন নেতিবাচক বিষয় নিয়ে খবর প্রকাশ শুরু করলে ধৈর্য হারায় রাজপরিবারগুলো। সৌদি আরব এই ইস্যুতে ২০০২ সালে কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। পরে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশে লাগাম টানার প্রতিশ্রুতি দিলে ২০০৭ সালে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন করে দেশটি। এ ছাড়া ২০১৭ সালে মিত্রদের নিয়ে কাতারের ওপর সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করে সৌদি। অবরোধ তুলে নিতে দেওয়া ১৩টি শর্তের অন্যতম ছিল আল-জাজিরা বন্ধ করে দেওয়া।

শায়খা মোজাহর হাত ধরে শিক্ষায় বিপ্লব

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাতারের ভাবমূর্তি বাড়তে বড় ভূমিকা রেখেছে কাতার ফাউন্ডেশন এবং দেশটির শিক্ষার বিশ্বায়ন। রূপকল্প-২০৩০ অংশ হিসেবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার মাধ্যমে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয় দোহা। এ ক্ষেত্রে কাতার ফাউন্ডেশন ও এডুকেশন সিটি প্রতিষ্ঠায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন সাবেক আমির শেখ হামাদের দ্বিতীয় স্ত্রী শায়খা মোজাহ।

কাতার ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য হলো কাতারের নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও গবেষণায় দক্ষ করে গড়ে তোলা। একসময় কাতারের নারীদের চার দেয়ালে বন্দী থাকতে হতো। অথচ পরিকল্পনা ও পরিসংখ্যান কর্তৃপক্ষের ২০১৯ সালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাতারের ৪২ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটই নারী।

শিক্ষায় পশ্চিমা মান অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে কাতারের। দেশীয় মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা রয়েছে দেশটিতে। এর কয়েকটি হলো জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ফরেন সার্ভিস, নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি, কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন।

আঞ্চলিক বিরোধ ও বয়কট

সৌদিসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কাতারের বিরোধ দেশটির গোড়াপত্তন থেকে। বর্তমানে ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য লড়াই করা একই উপজাতির লোকজনই দেড় শ বছর আগেও যুদ্ধে জড়িয়েছেন। তারা হলো সৌদি আরবে সউদ, কাতারে আল-থানি, বাহরাইনে খলিফা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আল-নাহিয়ান পরিবার।

সৌদি আরবের কেন্দ্র থেকে এসে কাতারে বসবাস শুরু করেছিল অনেকটা অপরিচিতি আল-থানি বেদুইন পরিবার। তখন দেশটি শাসন করতেন বাহরাইনের খলিফারা। আমিরাতের আল-নাহিয়ান পরিবারের সহায়তায় ১৮৬৭ সালে তাদের উৎখাতের চেষ্টা চালান বাহরাইনের বাদশাহ। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর পর থেকেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে অস্বস্তি নিয়ে বসবাস আল-থানি পরিবারের।

সৌদি আরবের সঙ্গে বর্তমান বৈরিতার সূত্রপাত হয় বড়দাগে যখন সুইজারল্যান্ডে অবকাশ যাপনে থাকা বাবা শেখ খলিফাকে ১৯৯৫ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরিয়ে কাতারের ক্ষমতা দখল করেন শেখ হামাদ। কারণ, শেখ খলিফা সৌদি রাজপরিবারের অনুগত ছিলেন। সেই বিরোধ চূড়ান্ত রূপ নেয় ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে কাতার উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রাখলে এবং আরব বসন্তের পক্ষে অবস্থান নিলে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ৫ জুন সৌদি ও তার আরব মিত্ররা কাতারের ওপর সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করে। এই অবরোধ আরোপে প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। এতে অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক চাপে পড়ে যায় কাতার। তবে মাথা নত করেনি তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ দেশটি। শেষ পর্যন্ত কুয়েত এবং ওমানের মধ্যস্থতায় ২০২১ সালের জানুয়ারিতে অবরোধ তুলে নেয় সৌদি জোট।

দোহায় কাতার ফাউন্ডেশনে কর্মরত মোহাম্মদ রোয়াইলি বলেন, ‘এটা নতুন কিছু নয়। আরবের গোত্রগুলো সব সময় একে অন্যের সঙ্গে লড়াই করে আসছে। আর এটা হলো আধুনিক সংস্করণ। এই বৈরিতা আমাদের মধ্যে অতীতেও ছিল। এটি একটি ঐতিহাসিক বিষয়।’

কাতার বিশ্বকাপ ও বিতর্ক

সফলভাবে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন সম্পন্ন করতে পারলে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে কাতার। আগামী ২০ নভেম্বর বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজনগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এই ক্রীড়া আসর বসবে। এতে ৩২টি দেশ অংশগ্রহণ করবে। দলের সংখ্যা ৪৮ তে উন্নীত করার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা থেকে সরে আসে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।

যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ২০১০ সালের ২ ডিসেম্বর কাতার মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম কোনো দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজনের যোগ্যতা অর্জন করে। কিন্তু এর পর থেকে বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না দোহার। আল-থানি পরিবার টাকার বিনিময়ে বিশ্বকাপ আয়োজন বাগিয়ে নেয় বলে অভিযোগ ওঠে। তদন্ত কমিটি গঠন করে ফিফা। ঘটে কর্মকর্তা বহিষ্কারের ঘটনাও। যদিও শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগ থেকে কাতারকে দায়মুক্তি দেওয়া হয় তদন্ত প্রতিবেদনে।

বিশ্বকাপ আয়োজনে অবকাঠামো নির্মাণে মরিয়া হয়ে নামে কাতার। আটটি স্টেডিয়ামে হবে খেলা। এর মধ্যে সাতটিই নতুন করে নির্মাণ করতে হয়। নির্মাণ করা হয় একটি নতুন বিমানবন্দর, একটি মেট্রো ব্যবস্থা, অনেকগুলো সড়ক ও প্রায় ১০০টি নতুন হোটেল। ফাইনাল ম্যাচের জন্য নির্মিত লুসাইল স্টেডিয়ামকে ঘিরে পুরো একটি শহর গড়ে তোলা হয়। এই স্টেডিয়ামে একসঙ্গে ৮০ হাজার দর্শক খেলা দেখতে পারবেন।

কাতার সরকার জানায়, কেবল স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্যই ৩০ হাজার বিদেশি শ্রমিক আনা হয়। তাঁদের অধিকাংশই বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ফিলিপাইনের। কিন্তু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে শ্রমিক শোষণের গুরুতর অভিযোগ আনা হয় কাতারের বিরুদ্ধে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের যোগ্যতা অর্জনের পর দেশটিতে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার সাড়ে ৬ হাজার শ্রমিক মারা গেছেন। দূতাবাসের দেওয়া সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই তথ্য দেওয়া হয়।

তবে কাতার বলছে, পুরো বিষয়টিই বিভ্রান্তিকর। অন্যান্য কারণে মারা যাওয়া শ্রমিকদের সংখ্যাও এই পরিসংখ্যানে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এসব শ্রমিকের সবাই বিশ্বকাপ সম্পর্কিত প্রকল্পে নিয়োজিত ছিলেন না। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল নাগাদ স্টেডিয়াম নির্মাণসংক্রান্ত কাজে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কাজ করার সময় মৃত্যু হয়েছে মাত্র তিনজনের। যদিও সমালোচনার মুখে শ্রম আইন ও শ্রমিক অধিকার সম্পর্কিত বিষয়ে বড় সংস্কার আনে দোহা।

কী বলছেন অভিবাসীরা

কাতারের রাজধানীতে সবজি সরবরাহের কাজ করে থাকেন মো. গোলাম কিবরিয়া। গত সপ্তাহে বাংলাদেশে ফিরেছেন তিনি। ফেনীর এই বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, বিশ্বকাপ ঘিরে কড়াকড়ির কারণে এই সময়টুকুতে দেশে অবস্থান করাই শ্রেয়তর হবে বলে মনে করছেন।

গোলাম কিবরিয়া বলেন, বিশ্বকাপ ঘিরে দোহা থেকে অভিবাসী শ্রমিকদের অন্যত্র সরে যেতে বলা হয়েছে। কারও কাগজপত্রে সামান্য ত্রুটি দেখলে নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু দোহা নয়, ছোট্ট দেশ বলে পুরো কাতারেই এমনটা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শ্রম অধিকারের বিষয়ে এই অভিবাসী বলেন, আইনে শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি আছে। কিন্তু নিজ দেশের দূতাবাস থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এ ছাড়া দীর্ঘসূত্রতার কারণে ঝামেলা এড়াতে শ্রমিকেরা আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে তেমন আগ্রহী হন না।

দোহার বাইরে মধ্য কাতারের আশ-শাহানিয়াহ এলাকায় আছেন ফেনীর আরেকজন মীর হোসেন। শ্রম অধিকার নিয়ে তাঁর সঙ্গেও কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, গুটিকয় কোম্পানি শ্রমিকদের শোষণ করে থাকে। বিশেষ করে, অবৈধভাবে অবস্থান করা শ্রমিকদের কম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কাজ করিয়ে থাকে এসব কোম্পানি। ফলে শ্রমিকেরা নিজেরা বিপদে পড়ার আশঙ্কায় আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না। বিশ্বকাপের কারণে দোহাকেন্দ্রিক কড়াকড়ির কথা জানিয়েছেন তিনি।

বৈশ্বিক মঞ্চে কাতার

আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও কাতারের ভূ-কৌশলগত অবস্থান আরব উপদ্বীপে দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ করে দিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ভিত্তি। কাতার বিশ্বের শীর্ষ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক দেশ। অবশ্য বিমান পরিবহন থেকে ফুটবল ক্লাব—বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য এনেছে আল-থানি পরিবার। রূপকল্প-২০৩০–এর মাধ্যমে কাতার খনিজ সম্পদ নির্ভর অর্থনীতিকে মেধা নির্ভর অর্থনীতিতে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধের পথ ধরেই কাতার রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন। ক্ষুদ্র দেশটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে বৈশ্বিক রাজনৈতিক মঞ্চের অংশ হওয়ার বিকল্প নেই। শেখ হামাদ ও শেখ তামিমের হাত ধরে সেই পথে দৃঢ় ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে কাতার। তবে বৈরী প্রতিবেশী আর সৌদি, ইরান, তুরস্ক ও আমিরাতের আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াইয়ে এই পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ হয়নি আল-থানি পরিবারের জন্য। নেপথ্যে আছে বৈশ্বিক রাজনীতিও। অবশ্য এখন পর্যন্ত ‘উন্নত মম শির’ মন্ত্রে সব প্রতিকূলতা মাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কাতার।

বিশ্বকাপ বিতর্ক নিয়ে কয়েক দিন আগে মুখ খুলেছেন কাতারের আমির শেখ তামিম। সমালোচকদের তোপ দাগিয়ে তিনি বলেছেন, বিশ্বকাপ আয়োজক হিসেবে কাতারের আগে অন্য কোনো দেশ এতটা ‘অপপ্রচারের’ শিকার হয়নি। সফলভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন সম্পন্ন করতে পারলে হয়তো সমালোচকদের প্রতি সবচেয়ে ভালো জবাবটা দিতে পারবে কাতার। এতে বৈশ্বিক মঞ্চেও নিজেদের জায়গাটা আরও একটু পোক্ত হবে আল-থানি পরিবারের।

আরও পড়ুন

মতামত দিন

আমাদের সম্পর্কে

We’re a media company. We promise to tell you what’s new in the parts of modern life that matter. Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo. Sed consequat, leo eget bibendum Aa, augue velit.