Home » বড় শিল্পনগর ঘিরে বিনিয়োগের সম্ভাবনা

বড় শিল্পনগর ঘিরে বিনিয়োগের সম্ভাবনা

0 মন্তব্য 24 ভিউজ

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর স্থাপনের কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে। প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ এখনও চলছে। তবে ইতোমধ্যে নানা সুবিধার কারণে শিল্পনগরটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মাঝে। ৫৭ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে সেখানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে ৬৭ লাখ ৬৪ হাজার ডলারের। বাকিটা স্থানীয়। এ পর্যন্ত কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের। শিল্পপ্রতিষ্ঠান করতে এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার একর জমি বরাদ্দ নিয়েছে দেশি-বিদেশি ১৩৬টি প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যে লক্ষ্য নিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় এই শিল্পনগর স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তত্ত্বাবধানে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে স্থাপিত হয়েছে এই শিল্পনগর। অবকাঠামোসহ সব কাজ শেষ হলে দেশের শিল্পনগর বা অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে এটিই হবে সবচেয়ে বড়। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় শিল্পনগর হতে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর।

শিল্পনগরটির প্রকল্প পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ফারুক সমকালকে বলেন, এটিকে একটি গ্রিন, পরিকল্পিত ও স্মার্ট শিল্পনগরে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলমান। মূলত সমুদ্রবন্দর ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাছাকাছি থাকায় এর কদর বেশি। এ ছাড়া চট্টগ্রামের বিমানবন্দরও কাছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের সুবিধাও পাওয়া যাচ্ছে। এসব বিষয়ে চিন্তা করেই বিনিয়োগকারীরা এ নগরীর প্রতি ঝুঁকছেন।

বেজার কর্মকর্তারা জানান, এ শিল্পনগরে মোট সাড়ে সাত লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। এতে একদিকে বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হবে নতুন গতি। নগরটিকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করা হয়েছে। যেখানে গড়ে উঠছে হালকা, মাঝারি, ভারীসহ সব ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান। থাকছে আলাদা আবাসিক, প্রশাসনিক, বিজনেস হাব ও সেবা অঞ্চল।

চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও সোনাগাজী উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত এই শিল্পনগরটির উন্নয়নে সহযোগিতা করছে বিশ্বব্যাংক, আইএফসি, জাইকা, ইউএনডিপি, এডিবি, ২০৩০ ওয়াটার রিসোর্স গ্রুপ এবং ভারত সরকার।

কী ব্যবস্থা থাকছে

যোগাযোগের সুবিধার জন্য শিল্পনগরকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য তিনটি সংযোগ সড়ক থাকছে। পরিবহন সুবিধার জন্য থাকবে আলাদা সড়ক। দুই লেনের সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। মালপত্র ও যাত্রী পরিবহনের জন্য রেলের ব্যবস্থাও থাকবে। রেলপথ তৈরির সমীক্ষা শেষ হয়েছে।

কারখানা ও আবাসিক এলাকার বর্জ্যপানি পরিশোধন করে নিস্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্থাপন করা হচ্ছে সিইটিপি। কঠিন শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনরায় ব্যবহার ও পানি সংরক্ষণের জন্য জলাধারের পরিকল্পনা রয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য খাল উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ‘গ্রিন টেকনোলজি’ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে এলাকাটি গড়ে উঠছে একটি স্মার্ট শিল্পনগর হিসেবে।

এ নগরে বিদ্যুতের চাহিদা হবে আনুমানিক ৩২০০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিডলাইন থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। ১৫০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণের কাজও শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই উৎপাদন শুরু হবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিরসনে তিনটি গ্রিড সাব-স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেলে পানির চাহিদা হবে আনুমানিক এক হাজার এমএলডি। ভূ-গর্ভস্থ উৎস থেকে পানি উত্তোলন ও প্রাকৃতিক উপায়ে পানির চাহিদা মেটানো হবে। এ ছাড়া বেজার নিজস্ব অর্থায়নে ‘পানি শোধনাগার ও গভীর নলকূপ স্থাপন’ হবে।

বিনিয়োগকারীদের পণ্য সরবরাহ সহজীকরণের জন্য একাধিক জেটি নির্মাণ করা হবে। রাখা হয়েছে আবাসন, পুনর্বাসন, বিনোদন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধার জন্য নির্দিষ্ট এলাকা। দক্ষ জনবল তৈরিতে বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাক) এ নগরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করবে।

ভূমি বরাদ্দ ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি

বিশ্বের খ্যাতনামা কিছু কোম্পানি এখানে ভূমি বরাদ্দ নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের কাজও শুরু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে- জাপানের নিপ্পন, ভারতের এশিয়ান পেইন্টস, আদানি ও যুক্তরাজ্যের বার্জার পেইন্টস এবং চীনের জুজু জিনউয়ান কেমিক্যাল, সিসিইসিসি, জাইহাং, ম্যারিকো ইত্যাদি।

ইতোমধ্যে আড়াই কোটি ডলার বিনিয়োগ করে উৎপাদন শুরু করেছে এশিয়ান পেইন্টস। ছয় কোটি ডলার বিনিয়োগ করে ম্যাকডোনাল্ড স্টিল বিল্ডিং প্রডাক্টস এবং নিপ্পন ও ম্যাকডোনাল্ড স্টিল যৌথ উদ্যোগে প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল তৈরির জন্য কারখানা নির্মাণ করেছে। তাদের উৎপাদনও শুরু করেছে। কেমিক্যাল উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত চীনের জুজু জিনউয়ান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রায় দুই কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি।

এ পর্যন্ত ১৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লিজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২১টি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দপত্র ইস্যু করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ১৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে ৭ লাখ ৬৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে এই শিল্পনগরীতে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগে ভার্জিন পিইটি চিপস প্রস্তুত করবে মডার্ন সিনটেক্স। আগামী মার্চে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে প্রতিষ্ঠানটি।

দেশে সর্বপ্রথম ইলেকট্রিক কার, লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি, মটর ও চার্জার উৎপাদনের জন্য ১০০ একর ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজকে।
৪ কোটি ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করবে এসকিউ গ্রুপের দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠান ভিকার ইলেকট্রিক্যাল ও টেকনো ইলেকট্রিক্যাল। তারা ইলেকট্রিক কেবলস, তার ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি তৈরি করবে। তাদের তিনটি ভবনের মধ্যে একটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।

বসুন্ধরা গ্রুপের বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইজেডকে ৪০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বসুন্ধরা কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ ও রেডিমিক্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রিজ স্থাপনের কাজ চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ৪৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিনিয়োগ হবে।

টিকে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামুদা কনস্ট্রাকশন ইতোমধ্যে উৎপাদন শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটি আমদানি বিকল্প পিএইচসি পাইল উৎপাদন করছে। ২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করবে আরমান হক ডেনিমস। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের মাঝামাঝি নাগাদ কারখানা স্থাপন শুরু করবে। প্রায় একই সময়ে কারখানা নির্মাণের কাজ শুরু করবে। বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের রং, অ্যাডহেসিভ ও নির্মাণ কেমিক্যাল প্রস্তুতের জন্য প্রায় দুই কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে।

৩০ একর জমিতে দুই কোটি ডলারের বিনিয়োগে ওষুধশিল্প এবং এপিআই কারখানা নির্মাণ করবে হেলথকেয়ার ফার্মা। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কেমিক্যাল শিল্প স্থাপনের জন্য ৬০ একর জমি বরাদ্দ পেয়েছে সামুদা ফুড প্রডাক্টস। পৌনে তিন কোটি ডলার বিনিয়োগ করে সৌন্দর্য ও প্রসাধনী ব্র্যান্ডের পণ্য উৎপাদন করবে ম্যারিকো বাংলাদেশ।

শিল্পনগরে থাকছে ইজেড

শিল্পনগরে জিটুজি ভিত্তিতে ৮৫৬ একর জমিতে স্থাপন করা হচ্ছে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল। এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাতের জন্য ২৩৯ একর ভূমিতে থাকছে বিজিএমইএ গার্মেন্টস ভিলেজ। ১১৩৮ একর ভূমিতে ইজেড স্থাপন করছে বেপজা। ৪৮৬ একরে হচ্ছে এসবিজি (শিকদার, বসুন্ধরা ও গ্যাসমিন) ইজেড।

আরও পড়ুন

মতামত দিন

আমাদের সম্পর্কে

We’re a media company. We promise to tell you what’s new in the parts of modern life that matter. Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo. Sed consequat, leo eget bibendum Aa, augue velit.