Home » শিশু হিন্দ ও তার উদ্ধারকারীদের যেভাবে মারল ইসরায়েলি বাহিনী

শিশু হিন্দ ও তার উদ্ধারকারীদের যেভাবে মারল ইসরায়েলি বাহিনী

0 মন্তব্য 16 ভিউজ

জ্বলন্ত গাড়িতে আটকে পড়া ছয় বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজব ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (পিআরসিএস) জরুরি নম্বরে ফোন করে তাকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিল। বলেছিল, ‘আমি খুব ভয় পাচ্ছি। দয়া করে তোমরা আসো।’ ফোনের লাইন যখন কেটে যায়, তখন সেখানে গুলির অনেক শব্দ হচ্ছিল। ১২ দিন সেখান থেকে হিন্দের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনা নিয়ে আল–জাজিরা অনুসন্ধান চালিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
কাতারভিত্তিক এই গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ২৯ জানুয়ারি ঘটনার সময় সেখানে ইসরায়েলের তিনটি ট্যাংক ছিল। তবে ২৪ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছে। তারা বলেছে, ঘটনার দিন সেখানে তাদের বাহিনীর কোনো সদস্য ছিলেন না।

হিন্দের সঙ্গে যা হয়েছিল

হিন্দের ওই ফোনকলটি তিন ঘণ্টা ধরে চলছিল। ওই ফোনকলের রেকর্ড এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে বিশ্বব্যাপী ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেখান থেকে জানা যায়, শেষ সময় হিন্দ ও তাঁর স্বজনদের সঙ্গে কী করা হয়েছিল।
চাচা-চাচি আর তিন চাচাতো ভাইবোনের সঙ্গে গাজা সিটি থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী তাল আল-হাওয়া যাচ্ছিল ছয় বছরের হিন্দ রজব। পথে তাদের বহনকারী গাড়িটি ইসরায়েলি ট্যাংকের মুখে পড়ে। এরপরই গাড়িটিতে আগুন ধরে যায়। এর মধ্যে বেঁচে যায় হিন্দ। সে গাড়িতে মারা যাওয়া অন্যদের মধ্যে আটকা পড়ে।
মুঠোফোনে হিন্দের আকুতি শুনে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (পিআরসিএস) সঙ্গে দুজন কর্মীকে পাঠানো হয়েছিল তাকে উদ্ধার করতে। সেখানে গেলে তাদেরও হত্যা করা হয়।
পিআরসিএসের অভিযোগ, হিন্দকে উদ্ধারে সেখানে যাওয়ার অনুমতি পেতে সংস্থার পক্ষ থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হয়েছিল। তারপরও ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে মেডিকেল দলকে লক্ষ্যে পরিণত করেছে।
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইসরায়েল নির্বিচারে গাজায় হামলা চালিয়ে হিন্দ ও তার চাচাতো ভাইবোনদের মতো হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করেছে। গত বছরের ৭ অক্টোবরের পর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৩০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েল যা বলছে
টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, গত ২৯ জানুয়ারি গাজা সিটির পার্শ্ববর্তী তাল আল-হাওয়া যখন হিন্দ ও তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্য নিহত হয়, তখন সেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর কোনো সদস্য ছিলেন না।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মনে হচ্ছে… ওই গাড়ির কাছে বা যে গাড়ির (হিন্দ যে গাড়িতে ছিল) কথা বলা হচ্ছে সেটিকে গুলি করা যায়, এমন দূরত্বে ইসরায়েলি বাহিনীর কেউ ছিলেন না।’
তবে ইসরায়েলের এই বিবৃতি হচ্ছে হিন্দ ও পিআরসিএসের ফোনালাপের পুরোপুরি বিপরীত।
বিবৃতিতে ওই এলাকায় সেনাদের ঘাটতি ছিল দাবি করে ইসরায়েল জানায়, ‘ওই শিশুটিকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে অ্যাম্বুলেন্স বা অন্য কোনো পরিবহন পাঠানোর জন্য আলাদা করে সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল না।’
অথচ পিআরসিএসের বিবৃতিতে বলা হয়, তারা হিন্দকে উদ্ধারে লোক পাঠানোর বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা করেছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে দাবি করা হয়, গাজা উপত্যকাজুড়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের অবাধে চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে।
অথচ গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অসংখ্য ঘটনা তাদের এই বক্তব্যের পুরোপুরি বিরোধী। হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অসংখ্য হামলার ঘটনা ঘটেছে।
আল–জাজিরা অনুসন্ধানে যা পেয়েছে
আল-জাজিরার অনুসন্ধান ইউনিট ঘটনার সময় হিন্দের সেই গাড়িটির কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতি ছিল, তা প্রমাণ করতে ফোন রেকর্ড ও স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে দেখেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৯ জানুয়ারি দুপুরের পরপর তাল আল-হাওয়ার একটি পেট্রল স্টেশনের কাছে ওই গাড়িটিকে থামায় ইসরায়েলি সেনা সদস্যরা।
হিন্দের চাচার ফোন থেকে জার্মানিতে এক আত্মীয়ের কাছে একটি কল যায়। এতে পিআরসিএস কল কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। দুই ফোন নম্বরের মধ্যে যেসব বার্তা আদান–প্রাদান হয়, সেগুলোও আল–জাজিরার হাতে এসেছে। যে সময়টাতে এসব বার্তা আদান–প্রদান হয়, তখন হিন্দ ও তার ১৫ বছর বয়সী চাচাত বোন লায়ান বেঁচে ছিল।
লায়ান প্রথম পিআরসিএসকে কল দেয়। জানায়, তাদের গাড়ির কাছেই ইসরায়েলের কয়েকটি ট্যাংক। সে বলে, ‘তারা আমাদের ওপর গুলি করছে। ট্যাংকটি আমার পাশে দাঁড়িয়ে।’ এর মিনিট খানেকের মধ্যেই ব্যাপক গুলির শব্দ পাওয়া যায় এবং ভয়ে চিৎকার করা লেয়ানের কণ্ঠ থেমে যায়।
এরপর হিন্দ ফোনটি তুলে ধরে পিআরসিএসের সঙ্গে কথা বলে। সেও জানায়, তারা যে গাড়িতে আছে, তার পাশেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর গাড়ি। সে বলে, ‘ট্যাংকটি আমার পাশে। আমাদের গাড়ির সামনের দিক দিয়ে এটি আসছে।’ প্রায় তিন ঘণ্টা পর হিন্দের সঙ্গে সংযোগটি কেটে যায়।
২৯ জানুয়ার দুপুরে স্যাটেলাইটে তোলা ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে আল–জাজিরার দেখেছে, হিন্দ ও লেয়ানের যে বক্তব্য, এই ছবি সেটাকেই সমর্থন করে। ছবিতে দেখা গেছে, ওই গাড়ি থেকে ২৭০ মিটার (৮৮৬ ফুট) দূরে ইসরায়েলের তিনটি ট্যাংক এবং সেগুলো ওই গাড়ির দিকে তাক করে রাখা।
উদ্ধারকারীরা ১০ ফেব্রুয়ারি যখন হিন্দ ও তার পরিবারের সদস্যদের মরদেহ পায়, তখন গাড়িটি গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা অবস্থায় ছিল। সম্ভবত একাধিক দিক থেকে গুলিগুলো এসেছিল।

অ্যাম্বুলেন্সের কী হয়েছিল

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে অনুমতি পেতে পিআরসিএসের কয়েক ঘণ্টা লেগেছিল। পরে ঘটনার দিন ২৯ জানুয়ারি স্বাস্থ্যকর্মী ইউসুফ জেইনো এবং আহমেদ আল-মাধোন যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছান, ততক্ষণে সন্ধ্যা ৬টা।
অ্যাম্বুলেন্সটি হিন্দের কাছাকাছি পৌঁছানোর পরপরই জেইনো তাঁর সহকর্মীদের বলেছিলেন, ‘আমি প্রায় কাছাকাছি আছি। কিন্তু সেই দুই উদ্ধাকর্মী আর কখনোই হিন্দের কাছে পৌঁছাতে পারেননি।
হিন্দের সঙ্গে লাইনে থাকা পিআরসিএসের কর্মকর্তা রানা ফকিহ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা গুলির শব্দ শুনেছি, আমরা চিন্তাও করতে পারেনি, তারা তাদের (দুই স্বাস্থ্যকর্মী) ওপর গুলি করবে। গোলাগুলির পর সবকিছু শান্ত হয়ে যায়।’
তাল আল-হাওয়া থেকে ইসরায়েলি সেনা সরিয়ে নেওয়ার ১২ দিন পর ১০ ফেব্রুয়ারি সেখানে ওই দুজনের মরদেহ পওয়া যায়। সানাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অ্যাম্বুলেন্সটি পুরো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। দেখে মনে হয়েছে ট্যাংকের তাড়া খেয়ে এটি ছুটেছে।

এরপর কী

ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এ ঘটনায় প্রমাণ দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ইসলায়েলি কর্তৃপক্ষকে এ ঘটনায় জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করতে বলেছি।’
হিন্দের মৃত্যুর ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে যা পাওয়া গেছে, তা গত শনিবার প্রকাশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সাংবাদকিদের বলেন, বিষয়টি আরও বিশ্লেষণের জন্য তদন্তের ভার জেনারেল স্টাফ ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং অ্যাসেসমেন্ট ম্যাকানিজমে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এ ধরনের আরেকটি ইসরায়েলি তদন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি। ২০২২ সালের মে মাসে ইসরায়েল গুলি করে আল-জাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহকে হত্যা করে। কয়েক মাস তারা তাঁকে হত্যার কথা–ই স্বীকার করেনি। পরে যখন স্বীকার করে, তখন তাদের দাবি, ‘এটি ইচ্ছাকৃত কোনো ঘটনা ছিল না।’

আরও পড়ুন

মতামত দিন

আমাদের সম্পর্কে

We’re a media company. We promise to tell you what’s new in the parts of modern life that matter. Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo. Sed consequat, leo eget bibendum Aa, augue velit.